বাজারে নতুন ও অপরিচিত এক ধরনের ডাল নিয়ে এখন ব্যাপক কৌতূহল—নাম তার ‘মথ ডাল’। সম্প্রতি এই ডালকে কৃত্রিমভাবে হলুদ রং মিশিয়ে মুগ ডাল নামে বিক্রি করার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এরপরই ভোক্তাদের সতর্ক করতে সংস্থাটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে এবং সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে তা প্রকাশ করে।
মথ ডাল কী এবং কোথায় জন্মায়
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে মথ ডালের কোনো উৎপাদন নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মথ ডাল খরা সহনশীল একটি ফসল, যা মূলত ভারতের রাজস্থান রাজ্যে উৎপাদিত হয়।
বিশ্বে উৎপাদিত মথ ডালের ৯৫ শতাংশের বেশি আসে ভারত থেকে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রেও কিছু পরিমাণে এই ডাল উৎপাদিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটি সাধারণত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রাজস্থানে ২০২৩–২৪ মৌসুমে প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার টন মথ ডাল উৎপাদিত হয়। রাজস্থানে এই ডাল দিয়ে স্থানীয় জনপ্রিয় খাবার পাঁপড় তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানির ইতিহাস
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি।
প্রথম চালান আসে রাজশাহীর বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিলের মাধ্যমে, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে—পরিমাণ ছিল ৬২ টন। ওই বছর মোট ৮ হাজার ৫১৬ টন মথ ডাল আমদানি হয়।
তবে ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়—অক্টোবর পর্যন্ত ২০ হাজার ৬৯১ টন মথ ডাল আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪০৮ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ৫৯টি প্রতিষ্ঠান হিলি, ভোমরা ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে এই ডাল আমদানি করছে।
মথ ডাল কেন মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি হচ্ছে
খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, মুগ ডাল কিছুটা গোলাকার, আর মথ ডাল লম্বাটে আকৃতির। কিন্তু হলুদ রং মেশানোর পর দুটির পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
মূল কারণ হলো দামের পার্থক্য।
-
মুগ ডালের আমদানিমূল্য কেজিপ্রতি ১ ডলার ৯ সেন্ট (প্রায় ১৩৩ টাকা)
-
মথ ডালের মূল্য ৮৫ সেন্ট (প্রায় ১০৪ টাকা)
অর্থাৎ, কেজিতে ২৯ টাকার পার্থক্য থাকায় ব্যবসায়ীরা কমদামের মথ ডাল রঙ মিশিয়ে বেশি দামে মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি করছেন।
খুচরা বাজারে মুগ ডাল যেখানে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০–১৬০ টাকা, সেখানে মথ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩০–১৪০ টাকায়।
আমদানিকারকের বক্তব্য
নিউ মাতৃভান্ডারের কর্ণধার বাদল তালুকদার জানান, ভারতের রাজস্থানে উৎপাদিত মথ ডাল দিল্লিতে প্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। আগের কিছু চালানে রং থাকলেও এখন আমদানিকৃত ডালে রং নেই বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, মুগ ডালের তুলনায় দাম কম হওয়ায় মথ ডালের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
মুগ ডালের আমদানি কমে যাচ্ছে
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে ৪৫ হাজার টন মুগ ডাল উৎপাদন হয়, এবং প্রায় ৩০ হাজার টন আমদানি করা হয়।
কিন্তু মথ ডাল আমদানি শুরু হওয়ার পর মুগ ডালের আমদানি দ্রুত কমে গেছে।
-
২০২২–২৩ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি হয় ২১ হাজার টন
-
২০২৩–২৪ অর্থবছরে কমে ১৮ হাজার টন
-
২০২৪–২৫ অর্থবছরে আরও কমে ১০ হাজার ৯১৩ টন
-
একই সময়ে মথ ডাল আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪১৪ টনে
বর্তমান ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে মুগ ডাল আমদানি হয়েছে মাত্র ২১৩ টন, অথচ মথ ডাল এসেছে ৬ হাজার ৭৯৯ টন।
রঙ মেশানো ডাল বিক্রি রোধে অভিযান
গত ২৮ অক্টোবর বিএফএসএ এনবিআরকে জানায়, মুগ ডাল নামে বিক্রি হওয়া ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৮টিতে ক্ষতিকর ‘টারটাজিন’ রং পাওয়া গেছে।
এরপরই দেশজুড়ে অভিযান শুরু হয়।
৫ নভেম্বর টাঙ্গাইলের ছয়আনী বাজারে রঙ মেশানো ডাল বিক্রির দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
বিএফএসএর চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন,
“ডালসহ কোনো শস্যে রং মেশানোর অনুমোদন নেই। টারটাজিন রং ব্যবহারে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য আমদানির সময় ডালে রং পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া এবং রং মেশানো ডাল আমদানি বন্ধে রাজস্ব বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
সারসংক্ষেপে, মুগ ডালের আড়ালে বাজারে এখন ছড়িয়ে পড়েছে মথ ডাল। কম দাম ও দেখতে মিল থাকায় ব্যবসায়ীরা ফায়দা তুললেও, ক্ষতিকর রং মেশানোর ফলে এতে তৈরি হচ্ছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সরকার এখন আমদানি ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই কড়া নজরদারিতে নামছে।
